
মেহেরপুরের গাংনীর তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক পুশ-ইনের শিকার দাবি করা রোজিনা খাতুন রোমানা নামের এক নারী পরিচয় ও স্থায়ী ঠিকানা নিশ্চিত না হওয়ায় চরম নিরাপত্তা ও আশ্রয়হীনতায় দিন কাটাচ্ছেন।
গত ৬ জুন বাংলাদেশে প্রবেশের পর থেকে চট্টগ্রামের পটিয়ার বাসিন্দা দাবি করা এই নারী গাংনীর বিভিন্ন গ্রামে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, বর্তমানে স্থানীয়দের সহায়তায় সাময়িক খাবার ও আশ্রয় মিললেও তার স্থায়ী পুনর্বাসন বা পরিবারের কাছে ফেরার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হয়নি।
শনিবার (১৪ জুন) গাংনীর কাজীপুর ও বামুন্দি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় তাকে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্বাভাবিকভাবে কথা বললেও অনেক সময় অসংলগ্ন আচরণ করেন। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ ও মানসিক চাপের কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ জুন ভোরে গাংনীর তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্ত এলাকায় পুশ-ইনের একটি ঘটনা নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৪০/৫-এস পিলার এলাকায় নারী ও শিশুসহ ছয়জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসীর বাধার মুখে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরে তারা শূন্যরেখায় অবস্থান করতে থাকে।
তবে একই সময়ে তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্তের ১৪০ নম্বর মেইন পিলারের ৪-এস সাব-পিলার সংলগ্ন অন্য একটি পয়েন্ট দিয়ে একজন নারী বাংলাদেশে প্রবেশ করেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
জানা যায়, ওই নারীই রোজিনা খাতুন রোমানা। সীমান্ত অতিক্রমের পর তিনি আতঙ্কিত ও দিশেহারা অবস্থায় একটি আমবাগানে আশ্রয় নেন। পরে পথ হারিয়ে গাংনীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াতে থাকেন।
বর্তমানে তিনি কাজীপুরের পীরতলা গ্রামে অবস্থান করছেন। স্থানীয়রা মানবিক কারণে তার খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করলেও দীর্ঘমেয়াদে তাকে আশ্রয় দেওয়ার সক্ষমতা তাদের নেই বলে জানিয়েছেন।
রোজিনা নিজের পরিচয় সম্পর্কে যা জানায়, তার বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া এলাকায়। বাবার নাম আব্দুল খালেক, মায়ের নাম ফাতেমা এবং ভাইয়ের নাম আব্দুর রহমান। স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপকালে তিনি আরও জানান, ভারতে প্রায় তিন বছর কারাভোগের পর গত ৬ জুন তাকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তার পরিচয় যাচাইয়ের জন্য তথ্য সংগ্রহ করা এবং পরিবারের সন্ধান বের করার চেষ্টা চলছে।
পীরতলা গ্রামের বাসিন্দা টগর খাতুন বলেন, ‘পাঁচ-ছয় দিন ধরে মেয়েটিকে আমাদের এলাকায় দেখতে পাচ্ছি। কথা বলে জানতে পেরেছি সে ভারত থেকে এসেছে। আমরা মানবিক কারণে খাবার দিচ্ছি। কিন্তু দীর্ঘদিন তাকে রাখার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই।’
স্থানীয় যুবক রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘২৭ থেকে ৩০ বছর বয়সি একটি মেয়ে রাতের বেলা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। বিষয়টি পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি। কিন্তু এখনো দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দ্রুত তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার।’
এ বিষয়ে গাংনী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আরশাদ আলী বলেন, ‘রোজিনার পরিচয় সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। সেসব তথ্য যাচাই করা হবে। আর পরিচয় নিশ্চিত না হলে সরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলম হুসাইন বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর সমাজসেবা অফিসের স্থানীয় কর্মীকে খোঁজখবর নিতে পাঠানো হয়েছিল। বর্তমানে মেয়েটি পীরতলা গ্রামের একটি বাড়িতে রয়েছে। সে যেন নিরাপদে থাকতে পারে সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরিবারের সন্ধান করার চেষ্টা চলছে।’
এদিকে গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রথমে নিশ্চিত হতে হবে তিনি বাংলাদেশের নাগরিক নাকি ভারতের। এছাড়া কীভাবে এখানে এসেছেন সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে তার নিরাপত্তার বিষয়েও প্রশাসনের নজর রয়েছে।’
আসিফ ইকবাল/এএইচ/এমএস












