রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬ | সময়: সকাল ৪:৪১

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর খোলা চিঠি

👁️ ১ Time View
Daraz horizontal banner

আলমগীর চৌধুরী আকাশ
আগামী ২১-২২ জুন মালয়েশিয়া সফরে আসছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এটি হবে তার প্রথম বিদেশ সফর। একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমরা তার সফলতা কামনা করি।
একই সঙ্গে মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত হাজারো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে কিছু প্রত্যাশার কথা তুলে ধরতে চাই, যা শুধু প্রবাসী শিক্ষার্থীদের নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আমি আলমগীর চৌধুরী আকাশ, আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়া (আইআইইউএম)-এর একজন পিএইচডি গবেষক। বাংলাদেশি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন মালয়েশিয়া (বিএসইউএম)-এর সাবেক সভাপতি এবং আইআইইউএম পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টস সোসাইটি (পিজিএসএস)-এর সাবেক সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক, প্রশাসনিক ও পেশাগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করার সুযোগ হয়েছে।
সেই অভিজ্ঞতা থেকেই মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের কিছু প্রত্যাশা বাস্তবায়নের নতুন দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
বর্তমানে মালয়েশিয়া এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে শত শত শিক্ষার্থী স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার জন্য এখানে আসছেন। তারা শুধু ডিগ্রি অর্জন করছেন না; বরং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের বৈশ্বিক কর্মবাজারের জন্য প্রস্তুত করছেন।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ থেকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা এখনো বঞ্চিত। মালয়েশিয়া সরকার বর্তমানে ৩২টি দেশের নাগরিকদের জন্য ১২ মাস মেয়াদি গ্র্যাজুয়েট পাস সুবিধা প্রদান করে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষে নির্দিষ্ট সময় মালয়েশিয়ায় অবস্থান করে চাকরি খোঁজা, কর্ম-অভিজ্ঞতা অর্জন এবং পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ পান।
এই সুবিধাপ্রাপ্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্রুনাই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিশ্বের বহু উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশ।
দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশ এখনো সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ হারাচ্ছেন। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হন, অথচ তাদের সহপাঠীরা গ্র্যাজুয়েট পাসের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শিল্প, প্রযুক্তি, গবেষণা ও করপোরেট খাতে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন।
আজকের বিশ্বে শুধু একটি ডিগ্রি যথেষ্ট নয়। বাস্তব কর্ম-অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাজ করার সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বৈশ্বিক পেশাগত নেটওয়ার্ক একজন শিক্ষার্থীকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে। গ্র্যাজুয়েট পাস শিক্ষা ও কর্মজীবনের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করে।
এখানে একটি যৌক্তিক প্রশ্ন উঠে আসে—ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া বা ভিয়েতনামের শিক্ষার্থীরা যদি এই সুযোগ পেতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা কেন বঞ্চিত থাকবেন?
আমরা জানি, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সময়েও বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। কিন্তু এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। তাই আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরে মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য গ্র্যাজুয়েট পাস সুবিধা অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হবে।
এটি কোনো বিশেষ সুবিধার দাবি নয়; বরং ভবিষ্যৎ দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের সেবাগুলোকে আরও শিক্ষার্থী-বান্ধব করা প্রয়োজন।
পাসপোর্ট নবায়ন, অ্যাটেস্টেশন, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি এবং অন্যান্য কনস্যুলার সেবা গ্রহণে শিক্ষার্থীদের অনেক সময় দীর্ঘ অপেক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক স্টুডেন্ট সার্ভিস ডেস্ক বা প্রায়োরিটি সার্ভিস কাউন্টার চালু করা হলে সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেস তৈরি করা। বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কতজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন, তাদের গবেষণার ক্ষেত্র কী এবং তারা কোন পর্যায়ে অধ্যয়ন করছেন—এসব তথ্যের কোনো সমন্বিত জাতীয় প্ল্যাটফর্ম নেই।
অথচ এমন একটি ডাটাবেস জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা, স্কলারশিপ প্রদান, গবেষণা অনুদান, ইন্টার্নশিপ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্পর্কে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এছাড়া বাংলাদেশ হাইকমিশনের অধীনে একটি ক্যারিয়ার অ্যান্ড এমপ্লয়েবিলিটি সাপোর্ট সেল গঠন করা যেতে পারে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন কোম্পানি, শিল্পখাত এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংযোগ স্থাপন সহজ হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক কর্ম-অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে সেই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারবেন।
আমাদের আরেকটি প্রত্যাশা হলো বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি গবেষকদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা, গবেষণা অর্জন, উদ্ভাবন কিংবা পেটেন্টের জন্য বিশেষ সম্মাননা ও অনুদান চালু করা হলে গবেষণার প্রতি আগ্রহ আরও বাড়বে এবং বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশি গবেষকদের নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আজকের বিশ্বে একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, তার মানবসম্পদ। মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির সম্ভাব্য চালিকাশক্তি। তাদের জন্য সঠিক নীতি, প্রয়োজনীয় সুযোগ এবং সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এর সুফল বহু বছর ধরে দেশ ভোগ করবে।
আমরা কোনো বিশেষ সুযোগ চাই না; আমরা চাই সমান সুযোগ। আমরা চাই আমাদের শিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষতাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজে লাগানোর সুযোগ। আমরা চাই এমন নীতি, যা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের শুধু ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করবে।
আপনার এই সফর যদি গ্র্যাজুয়েট পাস সুবিধা, শিক্ষার্থীবান্ধব কনস্যুলার সেবা, ক্যারিয়ার সহায়তা এবং গবেষণা সহযোগিতার মতো বিষয়গুলোতে বাস্তব অগ্রগতির পথ খুলে দেয়, তবে তা শুধু মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত হাজারো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর জন্য নয়, সমগ্র বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে।
আমরা আশাবাদী, আপনি আমাদের এই প্রত্যাশাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন।
লেখক:আলমগীর চৌধুরী আকাশপিএইচডি গবেষক, আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়া (আইআইইউএম)সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন মালয়েশিয়া (বিএসইউএম)সাবেক সভাপতি, আইআইইউএম পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টস সোসাইটি (পিজিএসএস)
এমআরএম

Daraz horizontal banner
technoviable
Daraz square banner
technoviable

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সম্পর্কিত পোস্ট