শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬ | সময়: রাত ৭:৫৭

সোয়া দুই কোটি টাকার প্রকল্প অচল, ময়লার স্তূপে বাড়ছে দুর্ভোগ

👁️ ৩ Time View

তিন দফা উদ্যোগ নিলেও ব্যর্থ
প্রতিদিন জমছে শত টন বর্জ্য
দুর্গন্ধে বিপর্যস্ত আশপাশের জনপদ

সোয়া দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত জৈব সার কারখানা দাঁড়িয়ে আছে, আছে সার উৎপাদনের অবকাঠামোও। নেই শুধু উৎপাদন। দশ বছরেও চালু না হওয়া এই প্রকল্পের কারণে রংপুর নগরীর বর্জ্য এখন খোলা আকাশের নিচে স্তূপ হয়ে জমছে। সেই বর্জ্যের দুর্গন্ধ ও দূষণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন আশপাশের হাজারো মানুষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্বপ্ন নিয়ে নেওয়া হয়েছিল প্রকল্পটি। পরিকল্পনা ছিল নগরীর পচনশীল বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার উৎপাদন করা হবে। এতে একদিকে নগরীর বর্জ্য কমবে, অন্যদিকে কৃষকরা পাবেন জৈব সার। কিন্তু প্রয়োজনীয় পচনশীল বর্জ্যের অভাব, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও পরিকল্পনার ঘাটতিতে সেই স্বপ্ন এখন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ।
তিন দফার উদ্যোগই ব্যর্থ
রংপুর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে নগরীর নাচনিয়া এলাকায় প্রায় এক একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয় জৈব সার উৎপাদন প্ল্যান্ট। প্রকল্পটির ব্যয় ছিল প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকা। পরিবেশ অধিদপ্তরের অর্থায়নে এটি বাস্তবায়ন করা হয়।

প্রথমে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তারা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেনি। পরে ২০২১ সালের শেষ দিকে ছিন্নমূল মহিলা সমিতির সঙ্গে নতুন চুক্তি করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় পচনশীল বর্জ্য সরবরাহ করতে না পারায় সেই উদ্যোগও ভেস্তে যায়। এরপর ২০২৪ সালে ‘রি-গ্রিন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান মৌখিক অনুমতি নিয়ে সার উৎপাদনের উদ্যোগ নিলেও সেটিও টেকেনি। ফলে তিন দফা চেষ্টা করেও প্রকল্পটি আজও চালু করা সম্ভব হয়নি।
সরেজমিনে নাচনিয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সার উৎপাদন প্ল্যান্টের ২১টি প্রকোষ্ঠই প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রতিটি প্রকোষ্ঠে প্রায় ১৫ টন পচনশীল বর্জ্য ধারণের ব্যবস্থা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ৩০ থেকে ৩৩ দিন বর্জ্য রেখে পচিয়ে পরে তা ছেঁকে জৈব সার তৈরির কথা। ১০ কেজি বর্জ্য থেকে ৩ থেকে ৪ কেজি সার উৎপাদনের সক্ষমতাও রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কোনো সার উৎপাদন হচ্ছে না। কেবল মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কিছু কার্যক্রম সীমিত আকারে চালু রয়েছে।
খোলা আকাশের নিচে বর্জ্যের পাহাড়
জৈব সার উৎপাদন বন্ধ থাকায় রংপুর নগরীর ৩৩টি ওয়ার্ডের বর্জ্য এখন ফেলা হচ্ছে কলাবাড়ি-রথবাড়ি এলাকার ডাম্পিং স্টেশনে।
২০১৯ সালে নতুন ডাম্পিং স্টেশন তৈরি হলেও সেখানে আধুনিক বা পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। প্রতিদিন ট্রাকের পর ট্রাক বর্জ্য এনে খোলা জায়গায় ফেলা হচ্ছে। বিশেষ করে নাচনিয়া, কলাবাড়ি ও রথবাড়িসহ এর আশেপাশের এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠছে দিন দিন।

রোদ-বৃষ্টি আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব বর্জ্য পচে চারপাশে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দূষিত তরল বর্জ্য বা লিচেট আশপাশের মাটি, খাল ও জলাশয়ে মিশে পরিবেশের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করছে।
নাচনিয়া গ্রামের মুদি দোকানি আতাউর রহমান বলেন, নাচনিয়ায় ডাম্পিং স্টেশন শুরু হলে এর দুর্গন্ধে এখানে টেকা দায় হয়ে পড়েছিল। সারাদিন নাক চেপে চলাচল করতে হতো। ঘরে বসে শান্তিতে খাওয়া-দাওয়া করার উপায় ছিল না। এখন এখানে ময়লা ফেলা বন্ধ হলেও প্রায় এক কিলোমিটার দূরের কলাবাড়ি ডাম্পিং স্টেশনের দুর্গন্ধ এদিকেও আসে।
আরও পড়ুনদূষণে বছরে পৌনে ৩ লাখ অকাল মৃত্যু, ধ্বংস হচ্ছে শিশুদের ভবিষ্যৎবায়ুদূষণের তালিকায় ঢাকা আজ ১৫ নম্বরে, শীর্ষে সান্তিয়াগোনীরব ঘাতক বায়ুদূষণ, বেশি ঝুঁকিতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ
রথবাড়ি এলাকার বাসিন্দা মিশাদ, রাশেদসহ অনেকে অভিযোগ করে বলেন, কলাবাড়ি-রথবাড়ি এলাকায় যেখানে ডাম্পিং স্টেশন তৈরি করা হয়েছে, সেখানে একসময় খেলার মাঠ ছিল। আশেপাশের অনেকে এসে এই মাঠে খেলাধুলা করতো। এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল মনোমুগ্ধকর। ডাম্পিং স্টেশন শুরুর পর খেলাধুলা তো দূরের কথা এখন এদিকে হাঁটাচলা করাও দায় হয়েছে।
রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন রথবাড়ি এলাকার বাসিন্দা চা-পান দোকানি মিন্টু বলেন, এখানে খোলা জায়গায় ময়লা ফেলার কারণে বৃষ্টি হলে বিষাক্ত পানি আশেপাশের ফসলি জমিতে গিয়ে পড়ে। এতে মাছচাষ ও কৃষকের ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় শেয়াল-কুকুর, কাক স্তূপ থেকে হাড়গোড় নিয়ে এসে অন্য জায়গায় ফেলে দিচ্ছে। এতে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।

মিন্টু বলেন, জায়গাটার চারপাশ ঘিরে (বাউন্ডারি ওয়াল) দিলে, পাশের খালটি সংস্কার করলে কিছুটা হলেও উপকার পাওয়া যেত।এসব বিষয় নিয়ে আগে মেয়রকে অনেকবার অভিযোগ দিলেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
কেন চালু হচ্ছে না প্রকল্প?
সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ সূত্র জানায়, জৈব সার তৈরির জন্য দৈনিক পচনশীল বর্জ্য লাগে ২০ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে মাত্র দুই থেকে তিন মেট্রিক টন বর্জ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। তবে মাঝেমধ্যে এটিও সম্ভব হয়ে ওঠে না। সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন বর্জ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০০ মেট্রিক টন। এর মধ্য থেকে ট্রাক ও ভ্যানে করে ৬০ থেকে ৬৫ মেট্রিক টন বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়।
এসব বর্জ্য নগরীর কলাবড়ি স্থানে খোলা জায়গায় ফেলা হয়। এই কাজে নিয়োজিত রয়েছেন ৮৬০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। কিন্তু সংগ্রহ করা এসব বর্জ্য হলো মিশ্র বর্জ্য। এসব বর্জ্য থেকে পচনশীল বর্জ্য তারা পৃথক করেন না। এ কারণে জৈব সার উৎপাদনের জন্য শুধু পচনশীল বর্জ্য দেওয়া সম্ভব হয় না।
রংপুর নগরীর সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীদের দাবি, শুধু পরিকল্পনাতেই সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুততম সময়ে এই বর্জ্য শোধন কেন্দ্রটি সংস্কার করে পুরোদমে চালু করা হোক। এতে একদিকে যেমন নগরী আবর্জনামুক্ত ও পরিচ্ছন্ন হবে, অন্যদিকে কৃষকরা সুলভ মূল্যে জৈব সার পাবেন এবং রক্ষা পাবে জনস্বাস্থ্য।
আরও পড়ুনপরিবেশবান্ধব ব্লক ইট ব্যবহারে উদ্যোগ আছে, অগ্রগতি নেইবিষ-প্লাস্টিক-বর্জ্যে বিপন্ন সুন্দরবনশহরের প্রবেশমুখে ৩০ বছরের বিষাক্ত ভাগাড়
পরিবেশ সুরক্ষা ফোরাম রংপুর এর সদস্য সচিব ফরহাদুজ্জামান বলেন, প্রতিনিয়ত রংপুর নগরীর জনসংখ্যা বাড়ছে। মূল শহরের ভেতরে বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম মোটামুটি সন্তোষজনক হলেও এর বাইরে এখনও সেভাবে ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। এখুনি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা উচিত। তা না হলে এ নগরীর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়বে।

রংপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রাকিব হাসান বলেন, বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যে সরকারি দুটি কনসালটেশন ফার্মের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, এটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া কলাবাড়ি ডাম্পিং স্টেশনে নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে। যেটা আগে ছিল না। যেহেতু এটা একটা টেকনিক্যাল পয়েন্ট তাই কনসালটেন্ট নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আমরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি, আশা করছি দ্রুত বাস্তবায়ন হবে।
জেডআইকে/কেএইচকে/এএসএম

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত পোস্ট