
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন বিনামূল্যে ব্যবহার করেন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে এসব প্ল্যাটফর্মে অর্থের বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পথে হাঁটছে এই অ্যাপগুলোর মূল সংস্থা মেটা। ফলে অনেক ব্যবহারকারীর মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে- বছরের পর বছর বিনামূল্যে সেবা দেওয়ার পর হঠাৎ কেন সাবস্ক্রিপশন চালু করছে কোম্পানিটি?
সম্প্রতি হোয়াটসঅ্যাপ ওয়েব ব্যবহারকারীদের কাছে ‘হোয়াটসঅ্যাপ প্লাস (WhatsApp Plus)’ নামে একটি প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশনের প্রস্তাব দেখানো শুরু হয়েছে। এটি হোয়াটসঅ্যাপের অফিসিয়াল অ্যাপের মধ্যেই থাকা একটি ঐচ্ছিক সেবা, যেখানে অতিরিক্ত কাস্টমাইজেশন ও চ্যাট ব্যবস্থাপনার কিছু সুবিধা দেওয়া হবে।
কী কী সাবস্ক্রিপশন চালু করেছে মেটা?
মার্ক জাকারবার্গের নেতৃত্বাধীন মেটা এরই মধ্যে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের জন্য বিভিন্ন সাবস্ক্রিপশন প্যাকেজ চালু করেছে বা পরীক্ষামূলকভাবে চালাচ্ছে।
ইনস্টাগ্রাম প্লাস (Instagram Plus), ফেসবুক প্লাস (Facebook Plus) ও হোয়াটসঅ্যাপ প্লাসের জন্য মাসে ১২৮.৬৮ টাকা করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেটা।
এছাড়া এআই-নির্ভর উন্নত সুবিধার জন্য আরও উচ্চমূল্যের পরিকল্পনাও পরীক্ষা করছে কোম্পানিটি। মেটা ওয়ান প্লাস (Meta One Plus) মাসে জন্য প্রায় ১,০০৮ টাকা ও মেটা ওয়ান প্রিমিয়ামের (Meta One Plus) জন্য মাসে প্রায় ২,৫২১ টাকা চার্জ যোগ করা হয়েছে।
এই প্যাকেজগুলোতে উন্নত এআই সুবিধা, বেশি জেনারেশন ক্ষমতা ও উচ্চতর রিজনিং সক্ষমতা দেওয়া হবে।
বর্তমানে মেটার প্ল্যাটফর্মগুলোর দৈনিক ব্যবহারকারী সংখ্যা প্রায় ৩৫০ কোটি।
এআইয়ের বিপুল ব্যয়ই কি আসল কারণ?
বিশ্লেষকদের মতে, এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে মেটার বিপুল বিনিয়োগ। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় এআই দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে মেটার বিরুদ্ধে। সেই ব্যবধান কমাতে কোম্পানিটি ব্যাপক অর্থ ব্যয় করছে।
সম্প্রতি মেটা ‘স্কেল এআই’ -এর প্রতিষ্ঠাতা অ্যালেক্সান্ডার ওয়াংকে নিজেদের ‘সুপারইন্টেলিজেন্স ল্যাব Superintelligence Lab’-এর নেতৃত্বে আনার জন্য ১৪.৩ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৪৩০ কোটি ডলারের চুক্তি করেছে।
একই সঙ্গে ২০২৬ সালের জন্য কোম্পানিটি মূলধনী ব্যয়ের (Capital Expenditure) পূর্বাভাস বাড়িয়ে ১২৫ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন বা ১৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত করেছে।
এই বিপুল অর্থ ব্যয় করা হবে-
এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে
কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরিতে
উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপ ও হার্ডওয়্যার কিনতে
নতুন এআই মডেল উন্নয়নে
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিজ্ঞাপনের আয়ের ওপর নির্ভর করে এত বড় ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে উঠছে।
ভারতের সঙ্গে বড় এআই অংশীদারত্ব
মেটার এআই পরিকল্পনা শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারতে রিলাইয়্যান্স ইন্ডাস্ট্রিস -এর সঙ্গে অংশীদারত্বে গুজরাটের জামনগরে একটি এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের কাজ চলছে।
গত সপ্তাহে ঘোষিত নতুন চুক্তির মাধ্যমে দুই কোম্পানি ভারতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে করপোরেট গ্রাহকদের জন্য এআইভিত্তিক সমাধান তৈরির উদ্যোগও সম্প্রসারণ করেছে।
বিজ্ঞাপনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা
মেটার জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো আয়ের উৎসের সীমাবদ্ধতা। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর মেটার মোট আয়ের ৯৭.৬ শতাংশই এসেছে বিজ্ঞাপন থেকে।
অর্থাৎ প্রায় দুই দশক ধরে পরিচালিত হওয়ার পরও মেটা কার্যত একক আয়ের উৎসের ওপর নির্ভরশীল।
এখানেই মেটার সঙ্গে বড় পার্থক্য রয়েছে গুগলের। বিজ্ঞাপননির্ভর প্রতিষ্ঠান হলেও গুগল বহু আগেই ক্লাউড, সফটওয়্যার, সাবস্ক্রিপশন ও অন্যান্য খাত থেকে উল্লেখযোগ্য আয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাকারবার্গ এখন সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছেন।
ব্যবহারকারীরা কি টাকা দিতে আগ্রহী?
এখানেই মেটার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বছরের পর বছর মানুষ এসব প্ল্যাটফর্ম বিনামূল্যে ব্যবহার করেছে।
বর্তমান প্রিমিয়াম সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে-
প্রোফাইল কাস্টমাইজেশন
স্টোরি কতজন পুনরায় দেখেছে তা জানার সুযোগ
গোপনে স্টোরি দেখার সুবিধা
অতিরিক্ত চ্যাট পিন করা
উন্নত সংগঠনিক টুল
তবে প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, এসব সুবিধা সাধারণ ব্যবহারকারীদের বড় অংশকে অর্থ খরচে উৎসাহিত করার মতো যথেষ্ট আকর্ষণীয় নয়। বরং এগুলো মূলত কনটেন্ট নির্মাতা, ইনফ্লুয়েন্সার ও ‘পাওয়ার ইউজার’দের লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে।
কোম্পানির ভেতরেও চাপ
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই-কেন্দ্রিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে মেটা সম্প্রতি প্রায় ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করেছে। একই সঙ্গে নতুন এআই বিশেষজ্ঞদের উচ্চ বেতন, প্রকৌশলীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব নিয়েও আলোচনা চলছে।
ফলে এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের দ্রুত আর্থিক ফল দেখানোর চাপও বাড়ছে।
ভবিষ্যতে কত আয় হতে পারে?
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ট্রুইস্ট সিকিউরিটিজের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মেটার সাবস্ক্রিপশন ব্যবসা থেকে বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন বা ২ হাজার কোটি ডলার আয় আসতে পারে।
অন্যদিকে ডয়েচে ব্যাংকের অনুমান, শুধু আগামী বছরেই সাবস্ক্রিপশন খাত থেকে অতিরিক্ত ১৫.৬ বিলিয়ন বা ১৫৬০ কোটি ডলার রাজস্ব আসতে পারে। তবে ওয়াল স্ট্রিটের অনেক বিশ্লেষক এসব পূর্বাভাস নিয়ে এখনো সন্দিহান।
তাহলে কি ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ পুরোপুরি পেইড হয়ে যাচ্ছে?
না। বর্তমানে মেটার মূল প্ল্যাটফর্মগুলো এখনো বিনামূল্যেই ব্যবহার করা যাবে। তবে কোম্পানিটি ধীরে ধীরে এমন একটি মডেলের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে সাধারণ ব্যবহারকারীরা ফ্রি সংস্করণ ব্যবহার করবেন, আর অতিরিক্ত সুবিধা ও উন্নত এআই সেবা পেতে হলে অর্থ দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মেটার এই পদক্ষেপ মূলত এআই যুগে নিজেদের ব্যবসাকে বিজ্ঞাপননির্ভরতা থেকে বের করে নতুন আয়ের উৎস তৈরির প্রচেষ্টা। কিন্তু ব্যবহারকারীরা এসব সুবিধার জন্য নিয়মিত অর্থ দিতে কতটা আগ্রহী হবেন, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সূত্র: এনডিটিভি
এসএএইচ












