বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সময়ের প্রয়োজনে ‘প্রজেক্ট ওরিয়েন্টেড একাডেমির’ দিকে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
তিনি বলেন, এরই মধ্যে সিলেবাস ও কারিকুলাম পরিবর্তনের কাজ শুরু হয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে এতে অনেকখানি পরিবর্তন আসবে এবং ২০২৮ সালে গিয়ে এ কারিকুলাম সম্পূর্ণ আপডেট ও আধুনিকায়ন করা সম্ভব হবে।
বুধবার (১৭ জুন) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে আয়োজিত প্রথম ডিন অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন তিনি।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, অতীতে বিভিন্ন সরকারের আমলে অনেকের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) হওয়ার চেয়ে ছাত্র সংগঠনের সভাপতি হওয়াকে বেশি লাভজনক ও মর্যাদাপূর্ণ মনে হয়েছে। ভিসিদের এমন মানসিকতা দেশের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।দেশের শিক্ষাব্যবস্থা দুর্বল করার উদ্দেশ্যেই অতীতে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল। একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে হলে তার শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করাই যথেষ্ট।
বিগত বছরগুলোর বাজেট বরাদ্দের সমালোচনা করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, অতীতে শিক্ষা খাতে জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হতো, যা ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। এর মধ্যেও অন্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট যুক্ত করে এক ধরনের 'শুভঙ্করের ফাঁকি' ছিল। বর্তমান সরকার শিক্ষার উন্নয়নে এবার বরাদ্দ ৮৭ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করেছে, যা জিডিপির সুনির্দিষ্টভাবে ২ শতাংশ প্রধানমন্ত্রীর ভিশন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে এই বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হবে। তবে বাজেটের প্রতিটি পয়সার যেন যথাযথ রিটার্ন আসে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
মেধার স্বীকৃতি ও জিয়া পরিবারের অবদান
মেধার মূল্যায়নের ওপর জোর দিয়ে ড. মিলন বলেন, ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে উত্তর আমেরিকায় শুরু হওয়া এই মেধার স্বীকৃতি আজ বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। বিগত বছরগুলোতে এই ধারাবাহিকতা বজায় না থাকাটা দুঃখজনক। তবে আজকের এই স্বীকৃতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি করবে।’
দেশের শিক্ষা প্রসারে জিয়া পরিবারের ঐতিহাসিক অবদান স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শিক্ষকদের জন্য উৎসব ভাতা ও এমপিও ভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করে শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করেছিলেন। একইভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও নারীদের শিক্ষায় এগিয়ে নিতে ‘খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা’ ও উপবৃত্তি চালু করেন। তাঁর শাসনামলে শিক্ষা খাত অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ছিল এবং কোনো সেশনজট ছাড়াই ক্লাস-পরীক্ষা সম্পন্ন হতো। এমনকি ব্রাহ্ম স্কুল থেকে শুরু করে আজকের এই ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় গঠনেও বেগম খালেদা জিয়ার অবদান অনস্বীকার্য।"
দক্ষ মানবসম্পদ ও মূল্যবোধের শিক্ষা
বিশাল জনসংখ্যাকে দেশের আশীর্বাদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে এবং এই খাতে এবার ১৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু জিপিএ-৫ পাওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতা থেকে বের হয়ে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে দূরে থাকার এবং যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন শিক্ষামন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, "জবির ঠিক ডান পাশে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্টাফদের থাকার একটি জায়গা পড়ে আছে। এই জায়গাটি যদি জবিকে হস্তান্তর করার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়, তবে আমরা সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে পারব। এটি জবির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি। তিনি এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল খালেক বলেন, ‘শিক্ষকেরা হলেন জাতির শ্রেষ্ঠ আদর্শ। তবে প্রফেসর বা ভিসি হওয়ার পর যখন শোনা যায় কেউ কেউ কোনো ছাত্র বা যুব সংগঠনের সভাপতি হতে চান, তখন জাতি হতাশ হয়। আমাদের যার যার অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন ও সন্তুষ্ট থাকা উচিত।’
নতুন ক্যাম্পাসের উন্নয়ন নিয়ে সচিব বলেন, ‘জবির দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের জন্য আমরা সর্বোত্তম বরাদ্দ দিয়েছি এবং গবেষণাগারের (ল্যাব) জন্যও বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নতুন ক্যাম্পাসে পুরোপুরি যাওয়ার আগ পর্যন্ত বর্তমান ক্যাম্পাসের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় জবির পাশে থাকবে।’
এসময় সভাপতির বক্তব্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইছ্ উদ্দীন বলেন, ২০০৫ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঘোষণার পর জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে জবি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রূপান্তরিত হয়। তৎকালীন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আজকের শিক্ষামন্ত্রীই এই আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অন্যতম রূপকার ছিলেন।
উপাচার্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যেহেতু এই বিশ্ববিদ্যালয় ম্যাডাম জিয়া প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাই বিগত ১৫-১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী সরকার ও তার দোসররা এই প্রতিষ্ঠানকে পদে পদে বঞ্চিত করেছে। ২১ বছরেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি হল পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়নি। অথচ সমসাময়িক অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক অবকাঠামোগত সুবিধা পেয়েছে।’
এদিন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ডিনস অ্যাওয়ার্ডে ১০৪ জনকে অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কলা অনুষদের ২১ জন, বিজনেস স্টাডিজ থেকে ১৬ জন, বিজ্ঞান অনুষদের ১৫ জন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ থেকে ১৭ জন, লাইফ অ্যান্ড আর্থ সায়েন্সেস অনুষদের ২৯ জন, আইন অনুষদের ৩ জন এবং চারুকলা অনুষদ থেকে ৩ জনকে এ অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়।
এসময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জবি কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন ও শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ড. মঞ্জুর মোর্শেদ ভূঁইয়া।
টিএইচকিউ/এমএএইচ/
Editor: TECHNO NEWS
Email :info@technoviable.com
Mobile : +8801914219906
৬২২, ফ্ল্যাট নং ১৩/বি, এভারগ্রীন মিজান স্কয়ার, বেগম রোকেয়া সরণি, ঢাকা-১২১৬, বাংলাদেশ।
Copyright TechnoNews 2025 | Developed By Technoviable