দেশের প্রায় ৪০ হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক পাস থাকার নিয়মে পরিবর্তন আনছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কমিটির সভাপতি হতে আর কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা থাকছে না।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক থেকে শুরু করে সব মহল ‘বিতর্কিত’ এ সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন নেটিজেনরা। পাশাপাশি সচেতন মহলও এ সিদ্ধান্ত থেকে সরকার তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সরে আসার আহ্বান জানাচ্ছে।
জানা যায়, মঙ্গলবার দুপুরে ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০২৪’ রিভিউ সংক্রান্ত এক সভা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সভাপতিত্ব করেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আব্দুল খালেক।
আরও পড়ুনম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে লাগবে না শিক্ষাগত যোগ্যতা!আমরা প্রতীক্ষায় আছি, গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি শিক্ষাব্যবস্থায় অবদান রাখবেপ্রধানমন্ত্রীর কর্মপরিকল্পনায় নারীর ক্ষমতায়নের রূপরেখা থাকবে
সভায় আলোচনার পর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বা গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করা হবে। এক্ষেত্রে বর্তমান প্রবিধানমালায় থাকা ‘ন্যূনতম স্নাতক পাস’ শিক্ষাগত যোগ্যতা বাতিল করে আগের নিয়মে ফেরানো হবে। অর্থাৎ, কমিটির সভাপতি বা বডির চেয়ারম্যান হতে নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজন হবে না।
সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয় যে, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বা গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান নিয়োগে সংসদ সদস্যের ক্ষমতা থাকবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান (প্রধান শিক্ষক/অধ্যক্ষ/সুপার), ইউএনও, ডিসি, বিভাগীয় কমিশনার হয়ে শিক্ষা বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যানের কাছে তিনজনের নামের তালিকা পাঠাবেন। সেখান থেকে একজনকে কমিটির প্রধান বা সভাপতি করবে শিক্ষা বোর্ড।
অন্যদিকে, ম্যানেজিং কমিটিতে বিদ্যোৎসাহী সদস্য, দাতা সদস্য, শিক্ষানুরাগীদের যুক্ত করা হবে। এসব পদ মূলত স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা অথবা তাদের অনুসারীরা দখলে নেন। ফলে অঘোষিতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে ফের রাজনৈতিক নেতাদের বসানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
তীব্র ক্ষোভ-অসন্তোষশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আজকের সভার সিদ্ধান্ত নিয়ে মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান/ ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে লাগবে না শিক্ষাগত যোগ্যতা!’ শিরোনামে জাগো নিউজে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর বিষয়টি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবাদটি শেয়ার করে অসংখ্য নেটিজেন এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান।
কামরুল হাসান নামে একজন শিক্ষক লেখেন, ‘শিক্ষা মানেই সার্টিফিকেট নয়। শিক্ষা মানে জাতির বিবেক, আদর্শ আর নৈতিকতার মেলবন্ধন। সরকারের এ সিদ্ধান্ত মানেই আগের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নোংরা রাজনীতির নতুন সমীকরণ। আফসোস এ জাতির জন্য। কিন্তু নাথিং টু ডু।’
জাগো নিউজের সংবাদের একটি স্ক্রিনশট শেয়ার করে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ লিখেছেন, ‘এর চেয়ে বাজে সিদ্ধান্ত আর কিছু হতে পারে না। স্কুল দখল নিয়ে আবার শুরু হবে স্থানীয় রাজনীতির নোংরা খেলা।’
কাওসার রহমান খান নামে একজন লিখেছেন, শিক্ষামন্ত্রীর চমক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে ‘শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগবে না’! বিশাল সংস্কারের পথে শিক্ষাব্যবস্থা। বলা চলে এ সংস্কার শিক্ষা ধ্বংসের জন্য উপকারী। ২০২৬ সালে এসেও যদি শিক্ষাগত যোগ্যতা না লাগে তাহলে শিক্ষার উন্নতি করে লাভ কি? আজকের সভায় সিদ্ধান্ত- স্কুল ও স্কুল অ্যান্ড কলেজের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির সভাপতি হতে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক পাসের নিয়ম বাতিল হচ্ছে।’
মাসুদ আলম নামে একজন শিক্ষক ব্যঙ্গ করে লিখেছেন, ‘বাহ! সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং টিপসই থাকাটাই যথেষ্ট!’ মাহবুব মোরশেদ নামে আরেকজন লেখেন, ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। আর অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত গ্রাম্য নেতারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেরুদণ্ড। শিক্ষামন্ত্রী চমৎকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অভিনন্দন আপনাকে! এভাবেই এগিয়ে যাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা।’
‘যোগ্যতা শিথিল নয়, বাড়ানো উচিত’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতিসহ সব পদের প্রার্থীর যোগ্যতা শিথিল নয়, বরং বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিষয়টি দুঃখজনক। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এ সিদ্ধান্ত যদি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নোংরা রাজনীতি আবারও আষ্টেপৃষ্ঠে ধরবে।’
অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতির স্নাতক পাস যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেটি বাতিল কেন করতে হবে? এটা তো খারাপ কিছু নয়। এমনও না যে, এ যোগ্যতার লোক নেই। প্রতিষ্ঠানগুলো কবজায় নিতেই যে এমন সিদ্ধান্ত, তা বলাই বাহুল্য। আমি মনে করি, কমিটির সভাপতিসহ সব সদস্যের যোগ্যতা আরও বাড়ানো উচিত।’
শিক্ষার কেউ মুখ খুলছেন না, সিদ্ধান্ত পরিবর্তন আসতে পারেবিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর তীব্র সমালোচনার মুখে এ নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি হচ্ছেন না। মাউশি, মাদরাসা অধিদপ্তর, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তারা কথা বলতে রাজি হননি।
একটি শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা নাম-পরিচয় প্রকাশ না করে রাতে জাগো নিউজকে বলেন, ‘মিডিয়ায় বিষয়টি আসার পর এটা নিয়ে ঝামেলা হচ্ছে। কারা বাইরে তথ্য দিয়েছে, তা নিয়ে জল্পনা চলছে। হয়তো সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারেন শিক্ষামন্ত্রী।’
কী আলোচনা হয়েছিল, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে মন্ত্রীর চেয়ে সচিব এটি করতে বেশি আগ্রহী ছিলেন। তারপর সিদ্ধান্ত হয় যে, এটি শিথিল করা হবে। এজন্য প্রবিধানমালা সংশোধন করে গেজেট জারি করা হবে। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি ঘোলাটে হয়ে গেছে। এখন এটা বাস্তবায়ন হবে কি না, তা বলতে পারছি না।’
শিক্ষাগত যোগ্যতার নিয়ম আগে যেমন ছিল২০২৪ সালের মে মাসের আগে দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতি হতে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন হতো না। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪ সালের মে মাসে ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০২৪’ প্রণয়ন করে।
ওই প্রবিধানমালায় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির যোগ্যতা বিষয়ে বলা হয়েছিল, এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ কোনো ব্যক্তি ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে নির্বাচিত হতে পারবেন না।
এরপর উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট প্রবিধানমালা সংশোধন করে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক পাস নির্ধারণ করে গেজেট জারি করে। সেই নিয়ম বাতিল করে ২০২৪ সালের আগের নিয়মে ফিরতে চাচ্ছে সরকার।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ৩৮ হাজার। এরমধ্যে মাধ্যমিক স্কুল প্রায় ১৮ হাজার, স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রায় দেড় হাজার, কলেজ ৩ হাজার ৩৪১টি, মাদরাসা (দাখিল-কামিল পর্যায়) ৯ হাজার ২৫৯টি এবং কারিগরি বা ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৫ হাজার ৩৯৫টি।
এএএইচ/এমএএইচ/
Editor: TECHNO NEWS
Email :info@technoviable.com
Mobile : +8801914219906
৬২২, ফ্ল্যাট নং ১৩/বি, এভারগ্রীন মিজান স্কয়ার, বেগম রোকেয়া সরণি, ঢাকা-১২১৬, বাংলাদেশ।
Copyright TechnoNews 2025 | Developed By Technoviable