বিশ্বকাপে অতিরিক্ত গরমের কথা চিন্তা এবার নতুন নিয়ম চালু করেছে ফিফা। যুক্তরাষ্ট্রের জুন-জুলাই মাসে গরম থাকায় এবং বিশ্বকাপের অধিকাংশ ম্যাচ তাদের দেশে হওয়ায় বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের প্রথমার্ধ ও দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি সময়ে ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ নামক পানি পানের বিরতির নিয়ম রেখেছে ফিফা। এতে করে খেলোয়াড়রা যেভাবে নিজেদেরকে গুছিয়ে নিতে পারেন তেমন প্রথম দিকের ভুলগুলো শুধরে নিতে পারে দলগুলো কোচের দিক নির্দেশনায়।
‘হাইড্রেশন ব্রেক’ নিয়ে ইতোমধ্যে নানা সমালোচনা করেছে বিভিন্ন ফুটবলার। ডাচ ফুটবলার ফন ডাইক প্রথম ম্যাচ শেষে জানিয়ে দেন, তিনি এটাকে সমর্থন করেন না। হাইড্রেশন ব্রেকের আড়ালে দেশগুলো স্পন্সরের মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার ইনকাম করছে বলেও অভিযোগ করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তবে মাঠের বাইরে যেটাই হোক, মাঠের খেলায় এই হাইড্রেশন ব্রেক নানাভাবে পাল্টে দিয়েছে ম্যাচের গতিপথ।
বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচে দুই অর্ধে দুইবার, ২৩তম মিনিটে থামানো হয় খেলা। ফিফা একে ‘হাইড্রেটিং ব্রেক’ বলে। জুন ও জুলাই মাসে উত্তর আমেরিকার উচ্চ তাপমাত্রার সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্যই এই ব্যবস্থাটি চালু করা হয়েছে। বিপত্তি ঘটে অন্য জায়গায়, যখন বৃষ্টি হয় বা ঠান্ডা থাকে যেমনটা হয়েছিল টরন্টোতে পানামার বিপক্ষে ঘানার ১-০ গোলের জয়ের ম্যাচে এমনকি ডালাসের মতো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়ামেও হাইড্রেশন ব্রেক দেওয়াতে৷
ব্রাজিল বনাম মরক্কোর ম্যাচে কথাই ধরা যাক। ম্যাচের প্রথমার্ধের ৩১তম মিনিটে বাম প্রান্ত থেকে ব্রুনো গুইমারেসের কাছ থেকে বল পেয়ে ভিনিসয়ুস জুনিয়র একজন ডিফেন্ডারকে ড্রিবল করে কাটিয়ে পেনাল্টি এরিয়ায় ঢুকে পড়েন এবং গোলমুখে শট নেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে করা এই প্রথম গোলটি মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ ড্র নিশ্চিত করে। এই গোলটিই প্রমাণ করে যে, কোচ কার্লো আনচেলোত্তি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাঠে হওয়া এই টুর্নামেন্টের নতুন ধরনের ফুটবল বুঝে গেছেন। ব্রাজিলের আক্রমণভাগের বাম দিকে যে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছিল, তা ছিল ২৩তম মিনিটে ইতালীয় কোচের করা একটি কৌশলগত পরিবর্তনের সরাসরি ফল। তিনি রাফিনহাকে ডান প্রান্তে সরিয়ে দেন। আর এই সিদ্ধান্তটি নেওয়া সহজ ছিল কারণ সেই মুহূর্তে পুরো দল আনচেলোত্তির পাশে দাঁড়িয়ে হাইড্রেশন বিরতির সময় তাঁর ব্যাখ্যা শুনছিল।
বাস্তবে, এই ‘কুলিং ব্রেক’ আমাদের পরিচিত ফুটবলের গতি প্রকৃতি বদলে দিচ্ছে। যে খেলাটিতে দুটি ৪৫ মিনিটের অর্ধাংশ ছিল এবং খেলোয়াড়রা মাঠের বাইরের খেলোয়াড়দের সামান্য প্রভাব নিয়েই কৌশলগত সমাধান খুঁজে নিতে বাধ্য হতেন, সেটি এখন অনেক বেশি কৌশলপূর্ণ খেলায় পরিণত হয়েছে। যেখানে প্রতি ২০ মিনিট পর পর কোচরা প্রতিপক্ষের খেলার ধরনের সাথে মানিয়ে নিতে খেলোয়াড়দের অবস্থান ও খেলার তীব্রতা সমন্বয় করতে পারেন। আর অবশ্যই, নিজেদের পা দুটোকে বিশ্রাম দিতে পারেন৷
টুর্নামেন্টের প্রথম ২৬টি খেলায়, প্রতিটি বিরতির পর ১০ মিনিটেরও কম সময়ে করা ৭টি গোলের মধ্যে ভিনির গোল একটি ছিল। এর সেরা উদাহরণ ছিল তুরস্কের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার ২-০ গোলের জয়। অস্ট্রেলিয়ার দুটি গোলই এসেছে হাইড্রেশন ব্রেকের পর। একটি প্রথমার্ধে এবং অন্যটি দ্বিতীয়ার্ধে। জাপান, বসনিয়া, সুইজারল্যান্ড এবং অস্ট্রিয়াও এর সুবিধা নিয়েছিল।
কোচকে দল সামঞ্জস্য করার জন্য দুটি সুযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং, বিরতিটি ইতিবাচক। কিন্তু বিরতির আগে যদি আপনি আধিপত্য বিস্তার করেন তবে বিরতির পরে আপনাকে সেই আধিপত্য পুনরায় গড়ে তুলতে আবার আপনাকে নতুন করে ছক সাজাতে হবে। যদি তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি বাড়ে, যেমনটা ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় হয়েছিল তাহলে এই ‘হাইড্রেটিং বিরতি’ খেলোয়াড়দের জন্য সঠিক এবং উপকারী।
কিন্তু ৩, ৪ বা ৫ মিনিটের বিরতি হাইড্রেটিংয়ের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। বিশ্বকাপের আগে খেলোয়াড় ও কোচদের সাথে কথা বলে এই পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন মিডফিল্ডার উইলিয়ান, যিনি বর্তমানে ব্রাজিলের ক্লাব গ্রেমিওতে খেলেন। ২০১১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ব্রাজিল জাতীয় দলের খেলোয়াড় হিসেবে খেলেছিলেন৷ বিশ্বকাপে এই পরিবর্তনগুলোর বাধ্যতামূলক হওয়ার কোনো প্রয়োজন তিনি দেখেন না। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় শরীরকে সতেজ রাখার বিরতি কেবল সবচেয়ে উষ্ণ জায়গাগুলোতেই দরকার। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রাজিলে আমি এই বিরতির কোনো প্রয়োজন দেখি না।’
ফিফার সিদ্ধান্তটি যতই বিতর্কিত হোক না কেন, এই পদক্ষেপের একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। নোভোরিজোন্তিনোর স্বাস্থ্য ও পারফরম্যান্স সমন্বয়কারী আনসেলমো সব্রাগিয়া বলেছেন যে, ‘দ্বিতীয়ার্ধে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ যা আগের বছরগুলোর পরিসংখ্যানের বিপরীত, যখন কোনো বিরতি ছিল না এবং খেলার শেষ পর্যায়ে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স কমে যেত। এটি এমন একটি পদক্ষেপ যা স্থায়ীভাবে বাস্তবায়ন করা উচিত। এটি ফুটবলের জন্য খুবই ফলপ্রসূ। যখন শারীরিক পারফরম্যান্স কমে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই আপনার জ্ঞানীয় এবং কৌশলগত দক্ষতাও হ্রাস পায়। আমাদের কাছে ডেটাবেস-ভিত্তিক গবেষণা রয়েছে যা দেখায় যে, একজন ক্রীড়াবিদ দ্বিতীয়ার্ধে পারফরম্যান্সের সমস্ত ক্ষেত্রে ১০% পর্যন্ত হারাতে পারেন।’
আরআর/আইএন
Editor: TECHNO NEWS
Email :info@technoviable.com
Mobile : +8801914219906
৬২২, ফ্ল্যাট নং ১৩/বি, এভারগ্রীন মিজান স্কয়ার, বেগম রোকেয়া সরণি, ঢাকা-১২১৬, বাংলাদেশ।
Copyright TechnoNews 2025 | Developed By Technoviable