মোস্তাকীম আহম্মেদ রাহুল
বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল ভক্তদের মধ্যে তর্কযুদ্ধ। ম্যারাডোনা থেকে মেসি, আর্জেন্টিনার ফুটবলের সৌন্দর্যে এদেশের একাধিক প্রজন্ম মাতোয়ারা হয়েছে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের খেতাব জয়ের পর ২০২৬ বিশ্বকাপে আরও একবার ফুটবল ভক্তদের আনন্দে উচ্ছ্বসিত করতে প্রস্তুত আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাস তাদের তারকা ফুটবলারদের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের মতোই রঙিন এবং সুসজ্জিত। ১৯৭৮, ১৯৮৬ এবং সর্বশেষ ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ী দল ছিল সময়ের সবচেয়ে ফেবারিট। গত বিশ্বকাপজয়ী দলটি এবারের আসরেও ফেবারিট হিসেবেই শুরু করতে যাচ্ছে তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা।
১৯৭৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার জয়ের নায়ক মারিও কেম্পেস সেবারের আসরে একই সাথে গোল্ডেন বুট এবং গোল্ডেন বল জিতেছিলেন। এমনকি সেবার ফাইনালেও এই কিংবদন্তি করেছিলেন দুটি গোল।
১৯৮৬ বিশ্বকাপে বিশ্বজয়ের নায়ক ছিলেন ম্যারাডোনা। যিনি সেই বিশ্বকাপের সেরা পারফরমার হিসেবে জিতেছিলেন গোল্ডেন বল। পাশাপাশি ওই আসরের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার হাত দিয়ে করা গোলটিও ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেই ‘হাত দিয়ে করা গোল’টি নিয়ে আজও তর্ক-বিতর্ক করতে দেখা যায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থক তথা ফুটবল ভক্তদের। একই ম্যাচে প্রথম গোলের মাত্র চার মিনিট পরেই, তিনি পাঁচজন ইংলিশ খেলোয়াড় এবং গোলরক্ষককে কাটিয়ে ১০ সেকেন্ডে ৬০ মিটারের এক দর্শনীয় ড্রিবল শেষে আবারও ইংল্যান্ডের জালে বল জড়ান। যে গোলটি পরবর্তীতে ফিফা ভক্তদের দ্বারা আনুষ্ঠানিকভাবে শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে নির্বাচিত হয়। শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি একটি টুর্নামেন্টে কমপক্ষে পাঁচটি গোল ও পাঁচটি অ্যাসিস্ট করেছেন।
এরপর ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের নায়ক ছিলেন ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৮বার ব্যালন ডি’অর জেতা ফুটবলার এবং তর্কসাপেক্ষে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ফুটবলার লিওনেল মেসি।
২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ের গোলে হেরে গিয়ে রানার্সআপ হলেও মেসি সেবার জিতেছিলেন গোল্ডেন বল। এরপর ২০২২ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে আবারও টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল তার হাতে ওঠে।
তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা সর্বমোট ১৬ বার কোপা আমেরিকা ট্রফি জিতেছে যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এছাড়া তারাই একমাত্র দল যারা ১৯৪৫,১৯৪৬ এবং ১৯৪৭ সালে পরপর তিনটি কোপা আমেরিকা জয় করেছে।
গত আসরের শিরোপাজয়ী এই দল এবার ফিফা র্যাংকিংয়ের শীর্ষে থেকে তাদের বিশ্বকাপযাত্রা শুরু করতে চলেছে। তবে ইতিহাস বলে যে আজ পর্যন্ত কোনো দেশ ফিফা র্যাংকিংয়ের শীর্ষে থেকে বিশ্বকাপ শুরুর পর শিরোপা জিততে পারেনি। এই অভিশাপ ঘোচানোর লক্ষ্য নিয়েই এবার মাঠে নামবে আলবিসেলেস্তেরা।
গত আসরের বিশ্বকাপজয়ী প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি এবারেও আর্জেন্টিনার ডাগ আউটে দাঁড়াবেন। ৪৮ বছর বয়সী এই কোচের গেমপ্ল্যান কিংবা ফরমেশন আগে থেকে আন্দাজ করা বেশ কঠিন। কারণ তিনি প্রতিপক্ষের খেলার ধরন এবং দলের অবস্থা অনুযায়ী আলাদা আলাদা লাইন আপ এবং গেমপ্ল্যান বাছাই করেন। অর্থাৎ যে কোনো দলের বিরুদ্ধে নামার আগেই যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করেই মাঠে নামেন তিনি।
জয়ের জন্য তার এই বারবার খেলার ধরন এবং ফরমেশন বদলকেই সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি বলা যায়। কারণ, তিনি প্রতিটা ম্যাচেই জেতার জন্য আলাদা আলাদা ট্যাক্টিক্স সাজান। ৪-৩-৩, ৪-২-২, ৫-৩-২ এবং ৪-৩-১-২ এই ফরমেশনগুলোর মধ্যেই সাধারণত তাকে সুইচ করতে দেখা যায়, যা প্রতিপক্ষের কাছে তার গেমপ্ল্যানকে আরও দুর্বোধ্য করে তোলে।
তবে এবারের আর্জেন্টিনা স্কোয়াডের দিকে তাকালে খুব বেশি চমক সেখানে দেখতে পাওয়া যায় না। মোটামুটি গত আসরের চেয়ে এবার দলে অল্প কিছু অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে। তাছাড়া মোটামুটি এবারেও আর্জেন্টিনার শুরুর একাদশ অনেকটা গত আসরের মতোই থাকবে বলে ধারণা করা যায়।
গোলবারের নিচে অ্যাস্টন ভিলার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের জায়গাটা মোটামুটি নিশ্চিত। তার ব্যাকআপ হিসেবে আছেন জেরেনিমো রুল্লি এবং হুয়ান মুসো।
মূল একাদশের ডিফেন্সে সেন্টার ব্যাক হিসেবে থাকছেন প্রিমিয়ার লিগের দুই ক্লাবের দু’জন ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ এবং ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো। তাদের ব্যাকআপ হিসেবে দলে আছেন ৩৮ বছর বয়সী প্রবীন ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্ডি, মার্সেইয়ের ডিফেন্ডার ফাকুন্দো মেদিনা এবং প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব বোর্নমাউথের হয়ে ফর্মে থাকা আরেক ডিফেন্ডার মার্কোস সেনেসি। তবে সেনেসির পজিশনে এর আগে কোচের পছন্দ ছিলেন লিওনার্দো বালের্দি; কিন্তু ইনজুরির কারণে তিনি ২৬ সদস্যের স্কোয়াড থেকে বাদ পড়েন।
ফুলব্যাক পজিশনে আর্জেন্টিনা বর্তমানে বেশ চিন্তায় আছে। কারণটা হচ্ছে ইনজুরি। লেফট ব্যাক হিসেবে নিকোলাস তালিয়াফিকো কোচের প্রথম পছন্দ হলেও ইনজুরিজনিত কারণে আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে তার খেলা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে তার জায়গায় দলের শুরুর একাদশে থাকতে পারেন ফাকুন্দো মেদিনা।
মেদিনা মূলত একজন সেন্টার ব্যাক হলেও বাঁ-পায়ের খেলোয়াড় হওয়ায় এবং লেফট ব্যাকে খেলার পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে প্রথম ম্যাচে কোচের শুরুর একাদশে তার থাকার সম্ভাবনাই বেশি। তবে তালিয়াফিকো পরের ম্যাচেই ফিরবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া রাইট ব্যাক পজিশনে আর্জেন্টিনার চিন্তার বিষয় আরেকটু বেশি। কারণ বিশ্বকাপ শুরুর আগমুহূর্তে ২৬ সদস্যের স্কোয়াডে ডাক পাওয়া দুজন ডিফেন্ডারই পরপর ইনজুরিতে পড়েন। তবে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী নাহুয়েল মলিনা ইনজুরি থেকে ফিরেছেন এবং আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে তাকেই শুরুর একাদশে দেখা যেতে পারে। তার ব্যাকআপ হিসেবে রয়েছেন গঞ্জালো মন্তিয়েল।
মিডফিল্ডে আর্জেন্টিনা দলে ২০২২ বিশ্বকাপের মিডফিল্ডটাকেই দেখতে পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজ এবং রদ্রিগো ডি পলই থাকতে চলেছেন শুরুর একাদশে।
এর বাইরে ম্যাচভেদে এবং কোচের ট্যাক্টিক্যাল পরিবর্তনের অংশ হিসেবে জিওভানি লো চেলসো কিংবা লিওনার্দো পারেদেসকেও কোনো কোনো ম্যাচে শুরুর একাদশে দেখা যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া মিডফিল্ডের ব্যাকআপ অপশন হিসেবে দলে আরও আছেন এজেকুয়েল প্যালাসিওস এবং ভ্যালেন্তিন বার্কো। চলতি মৌসুমে ইতালিয়ান ক্লাব কোমোর হয়ে ফর্মের তুঙ্গে থাকা নিকো পাজও আছেন ব্যাকআপে।
ফরোয়ার্ড লাইনে নিঃসন্দেহেই রাইট উইংয়ে থাকতে চলেছেন লিওনেল মেসি। লেফট উইংয়ে সম্ভবত দেখা যাবে অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদের হয়ে খেলা থিয়াগো আলমাদাকে। ক্লাবে কখনও লেফট মিড আবার কখনও অ্যাটাকিং মিডে খেলা এই ফুটবলারের চলতি মৌসুমে ২৭ ম্যাচে রয়েছে ৩টি গোল এবং ১টি এসিস্ট।
এছাড়া এবার ২৬ সদস্যের দলে রয়েছেন অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদের কোচ এবং আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি দিয়েগো সিমিওনের কনিষ্ঠ পুত্র হুলিয়ানো সিমিওনে। ২৩ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড দুই উইংয়েই সমানতালে খেলতে পারেন। চলতি মৌসুমে অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদের জার্সিতে তার ৩১ ম্যাচে রয়েছে ৪টি গোল এবং ৬টি এসিস্ট। তাছাড়া একই ক্লাবের আরেক ফুটবলার নিকো গঞ্জালেজও আছেন এবারের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে।
সবশেষে স্ট্রাইকার কিংবা নম্বর নাইন রোলে আর্জেন্টিনা রেখেছে তিনটি অপশন। তবে মূল একাদশে জায়গা পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে এগিয়ে থাকবেন ইন্টার মিলানের স্ট্রাইকার লওতারো মার্তিনেজ এবং অ্যাতলেটিকো মাদ্রিদের হুলিয়ান আলভারেজ। চলতি মৌসুমে দু’জনেই স্ব স্ব ক্লাবে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছেন গোল করার সক্ষমতার জোরে।
চলতি মৌসুমে লওতারো মার্তিনেজ ইন্টার মিলানের জার্সিতে ৩০ ম্যাচে গোল করেছেন ১৭টি এবং অ্যাসিস্ট করেছেন ৬টি। অন্যদিকে হুলিয়ান আলভারেজ চলতি মৌসুমে অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদের জার্সিতে ২৯ ম্যাচে করেছেন ৮টি গোল এবং ৪টি এসিস্ট।
তবে লিওনেল স্কালোনির নম্বর নাইন রোলে আলভারেজই বেশি পছন্দের খেলোয়াড় হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে তিনিই থাকতে চলেছেন মূল একাদশে। এর বাইরে ব্রাজিলিয়ান লিগের ক্লাব পালমেইরাসের স্ট্রাইকার হোসে ম্যানুয়েল লোপেজ রয়েছেন তৃতীয় অপশনের স্ট্রাইকার হিসেবে।
সর্বসাকুল্যে এবারের আর্জেন্টিনা দলকে দুর্বল বলার সুযোগ একদমই নেই। গত আসরের বেশিরভাগ খেলোয়াড় এখনও এই দলে আছেন, যা টুর্নামেন্টে তাদের বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। কারণ গত আসরের চ্যাম্পিয়ন তারাই। এদিকে ডি মারিয়া, মার্কোস আকুনার মতো খেলোয়াড়দের এবারের আসরে না থাকাটা দলকে ভোগাতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে।
ফেবারিটের তকমা গায়ে নিয়েই বুধবার বিশ্বকাপযাত্রা শুরু করতে চলেছে মেসির আর্জেন্টিনা। মেসির চোখে আবারও একবার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন। তবে সোনালি ট্রফিটা আবারও উঁচিয়ে ধরার সৌভাগ্য তার হবে কিনা সেটা মাঠের খেলায়ই নির্ধারিত হবে।
এমএআর/আইএইচএস
Editor: TECHNO NEWS
Email :info@technoviable.com
Mobile : +8801914219906
৬২২, ফ্ল্যাট নং ১৩/বি, এভারগ্রীন মিজান স্কয়ার, বেগম রোকেয়া সরণি, ঢাকা-১২১৬, বাংলাদেশ।
Copyright TechnoNews 2025 | Developed By Technoviable