নির্বাচনি রাজনীতিতে শুধু উচ্চারিত শব্দই বার্তা দেয় না, নীরবতাও দেয়। কোনো ইস্যুতে বারবার কথা বলা মানে সেটিকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের জায়গায় তোলা। আবার কোনো বিষয়ে একেবারেই কথা না বলা অনেক সময় বোঝায়—সে বিষয়টি অস্বস্তিকর, ঝুঁকিপূর্ণ অথবা সচেতন রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই এড়িয়ে যাওয়া।
ভোটের আগে দ্য হুইসেলের বিশ্লেষণই আপনাকে জানাবে, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আসলে কী বললেন, আর কৌশলে কী এড়িয়ে গেলেন।
নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছিল ২২ জানুয়ারি। প্রায় ২০ দিনের এই প্রচারণায় বিএনপি চেয়ারম্যান ও জামায়াতের আমির দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটেছেন, জনসংযোগ করেছেন এবং বক্তব্য রেখেছেন নির্বাচনি জনসভায়। তারেক রহমান তার এই সফর শুরু করেছিলেন সিলেট থেকে। অন্যদিকে শফিকুর রহমান নিজ আসন ঢাকা-১৫ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেন।
প্রচারণার এই সময়জুড়ে দুই শীর্ষ নেতা বহু জেলায় একাধিক জনসভায় কথা বলেছেন। ‘দ্য হুইসেল’ এই প্রচারণা থেকে বেছে নিয়েছে তাদের ১০টি করে মোট ২০টি জনসভায় দেওয়া বক্তব্য। ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাটাগরিতে ফেলে তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কোন ইস্যুতে নেতা কতটা শব্দ খরচ করেছেন আর কোন বিষয়ে প্রায় নীরব থেকেছেন, সেটাই এই বিশ্লেষণের মূল ভিত্তি।
এই শব্দভিত্তিক বিশ্লেষণ তুলে ধরছে নির্বাচনী রাজনীতির এমন কিছু দিক, যা সাধারণত স্লোগান আর বক্তব্যের ভিড়ে চোখে পড়ে না। কোথাও অতিরিক্ত শব্দ আর কোথাও সম্পূর্ণ নীরবতা, এই দুইয়ের মাঝেই লুকিয়ে আছে নির্বাচনী রাজনীতির অগ্রাধিকার ও কৌশলের ইঙ্গিত।
ইশতেহার ছাপিয়ে বিষোদ্গার
‘দ্য হুইসেল’-এর ডেটা বিশ্লেষণ বলছে, দুই নেতার লড়াইয়ের প্রধান অস্ত্র ছিল একে অপরকে আক্রমণ। তারেক রহমান তার বক্তব্যের ১১.৬৬ শতাংশ আর ডা. শফিকুর রহমান ১১.১০ শতাংশ শব্দ ব্যয় করেছেন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে। মজার ব্যাপার হলো, কেউই প্রতিপক্ষ দলের নাম সরাসরি উচ্চারণ করেননি। তবু ‘একটি বিশেষ দল’-কে ইঙ্গিত করে তারা সমালোচনার তীর ছুড়েছেন।
জামায়াতের আমিরের সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি ‘চাঁদাবাজ’। ১০টি জনসভার প্রতিটিতেই তার বক্তব্যে এই শব্দটি ঘুরেফিরে এসেছে। শুধু খুলনার জনসভায় তিনি নিজেদের প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন, আমরা কোনো চাঁদাবাজি করবো না। বাকি ৯টি জনসভায় তিনি এই শব্দ ব্যবহার করেছেন বিএনপিকে আক্রমণ করতে। ময়মনসিংহে শফিকুর রহমান বলেন, এখনই যারা মানুষের ওপর অত্যাচার করে, নির্যাতন করে, চাঁদাবাজি করে, লুণ্ঠন করে জনগণের সম্পদ; ক্ষমতায় গেলে এরা কী করবে? সারা বাংলাদেশকে কামড় দিয়ে খেয়ে ফেলবে।
শফিকুর রহমানের কৌশল ছিল বিএনপিকে ‘আওয়ামী লীগের বিকল্প সংস্করণ’ হিসেবে দেখানো। অর্থাৎ তারা ক্ষমতায় এলে আবারও সন্ত্রাস ও লুটপাট ফিরে আসবে, এই ভয়টিই তিনি ভোটারদের মনে ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছেন। এমনকি বিএনপি তাদের আমলে দেশকে ‘দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন’ করেছিল, সেটাও ভোটারদের মনে করিয়ে দেন। বাদ পড়েনি বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নিয়ে সমালোচনাও। ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন স্থানে দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির অভিযোগকে সামনে এনে জামায়াতের আমির নিজেদের ‘ডিসিপ্লিনড’ বা সুশৃঙ্খল দল হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করেছেন প্রায় সবগুলো জনসভায়।
অন্যদিকে, বিএনপি চেয়ারম্যান নির্বাচনী প্রচারণার শুরুর দিকের জনসভাগুলোতেই জামায়াতকে আক্রমণ করেন কৌশলী উপায়ে। সিলেটের জনসভায় তিনি হজ বা ওমরাহ করে এসেছেন, এমন একজন কর্মীকে মঞ্চে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করেন, এই দুনিয়ার মালিক কে? মূলত ‘জামায়াতকে ভোট দিলে জান্নাতে যাবে’--মাঠপর্যায়ে এমন প্রচারণার অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি এই প্রেক্ষাপট তৈরি করেন। তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনের আগেই একটি দল এই দিবো, ওই দিবো বলছে, টিকিট দিবো বলছে না? যেটার মালিক মানুষ না, সেইটার কথা যদি সে বলে এক শিরকি করা হচ্ছে, হচ্ছে না? যার মালিক আল্লাহ, যার অধিকার শুধু আল্লাহর একমাত্র সবকিছুর অধিকারের উপরে আল্লাহর অধিকার। কাজেই আগেই তো আপনাদেরকে ঠকাচ্ছে।
শুধু এখানেই থামেননি তারেক রহমান। জামায়াতের ‘পরিবারতন্ত্র’ খোঁচার জবাবে তিনিও ছাড় দেননি। সরাসরি নাম না নিলেও ‘ধর্মের নামে বিভাজন’ এবং ‘ষড়যন্ত্রকারী শক্তি’ সম্পর্কে তিনি সতর্ক করেছেন। কয়েকটি জনসভায় তিনি বলেন, যারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়, তাদের ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে।
তবে প্রচারণার মাঝামাঝি সময়ে দুই নেতার আক্রমণের ভাষা ভিন্ন মাত্রা পায় নারী ইস্যুতে। বিশেষ করে জামায়াতের আমিরের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে নারীকে অবমাননা করে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে, সেই ঢেউ এসে লাগে নির্বাচনী জনসভাতেও। খুলনার জনসভায় তারেক রহমান বলেন, আজ আমরা দেখেছি একটি রাজনৈতিক দলের নেতা পরিষ্কারভাবে নারীদের কীভাবে অসম্মানিত করেছে, তাদের খারাপ ভাষা দিয়ে অসম্মানিত করেছে।
পাল্টা জবাব দিতে দেরি করেননি জামায়াতের আমিরও। সিলেটের জনসভায় তিনি বলেন, আমি মা বোনদের ইজ্জতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছি, শক্ত গলায় কথা বলি এইজন্য ওইটা জড়াইয়ে আমার বিরুদ্ধে মিসাইল মেরে দিছে, চিন্তা করেন। আমার আইডি হ্যাক করে এরপরে চোর ধরা পড়েছে তারপরেও বড় গলায় কথা বলে।
তারেকের ‘কার্ড’ বনাম শফিকের ‘ইনসাফ’
নির্বাচনী মঞ্চের ‘শব্দ-জট’ খুললে দেখা যায়, দুই নেতার লড়াইয়ের ধরন ছিল সম্পূর্ণ দুই মেরুতে। ভোটারদের মন জয়ে তারেক রহমান যেখানে পকেটে সরাসরি অর্থনৈতিক সুবিধা পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি হিসেবে ‘কার্ড’ তত্ত্ব হাজির করেছেন, সেখানে ডা. শফিকুর রহমান সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি হিসেবে ‘ইনসাফ’ তত্ত্ব সামনে এনেছেন।
বিশ্লেষণ অনুয়ায়ী, তারেক রহমান তার বক্তৃতায় রাষ্ট্রকাঠামো ও অর্থনৈতিক সংস্কারকে ‘প্রোডাক্ট’ হিসেবে বিক্রি করেছেন। অন্যদিকে, ডা. শফিকুর রহমান বিক্রি করেছেন ‘মূল্যবোধ’ ও ‘নৈতিকতা’।
প্রতিটি নির্বাচনী জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’-এর প্রসঙ্গ তুলেছেন। খুলনা ও রংপুরের জনসভায় তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দেন, রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে প্রতিটি পরিবারের জন্য এই কার্ড চালু করা হবে, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সুবিধা সরাসরি মানুষের হাতে পৌঁছাবে। রাজশাহীতে তারেকের বক্তব্যের প্রায় ৩০ শতাংশ জুড়ে ছিল কৃষি ও সেচ।
১০টি জনসভা মিলিয়ে প্রতিপক্ষকে আক্রমণের পর তারেক রহমান সবচেয়ে বেশি শব্দ ব্যয় করেছেন কৃষি নিয়ে, যা প্রায় ১১ শতাংশ। এরপর কর্মসংস্থানে ৫.৮৯ শতাংশ, স্বাস্থ্যে ২.৮৪ শতাংশ, দ্রব্যমূল্য ও অর্থনীতিতে ২.২০ শতাংশ এবং শিক্ষায় ০.৭০ শতাংশ শব্দ খরচ করেছেন।
ভিন্নপথে হেঁটেছেন জামায়াতের আমির। তাঁর বক্তব্যে অর্থনীতির সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ না থাকলেও জোর দিয়েছেন ‘দুর্নীতিমুক্ত সমাজ’ এবং ‘নৈতিকতা’র ওপর। প্রায় সব জনসভায় তাঁর কথার মূল সুর ছিল, “আমরা ইনসাফ কায়েম করব”। তিনি ভোটারদের বুঝিয়েছেন, সমাজে যদি ইনসাফ থাকে, তবে মানুষ না খেয়ে মারা যাবে না। তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীককে কেবল নির্বাচনী প্রতীক নয়, বরং ‘ন্যায়বিচারের প্রতীক’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করেছেন।
দুর্নীতি বন্ধ করা থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান তৈরি ও গুম-খুন নিয়ে শফিকুর রহমান যতটা উচ্চকণ্ঠ ছিলেন, ততটাই কম কথা বলেছেন শিক্ষা, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাত নিয়ে।
দেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী। যেকোনো নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু নির্বাচনী মঞ্চের গর্জনে নারীরা আসলে কোথায়?
‘দ্য হুইসেল’-এর শব্দ-বিশ্লেষণ বলছে, প্রধান দুই দলের শীর্ষ নেতাই নারী ইস্যুতে কথা বলেছেন, তবে তা ৫ থেকে ৬ শতাংশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ। পরিসংখ্যানগতভাবে দুই নেতার অবস্থান কাছাকাছি মনে হলেও, তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে রয়েছে যোজন যোজন পার্থক্য।
বিএনপি নেতার বক্তব্যে নারীরা উঠে এসেছেন মূলত ‘অর্থনৈতিক ইউনিট’ বা পরিবারের চালিকাশক্তি হিসেবে। তারেক রহমান তার প্রায় প্রতিটি জনসভায়, বিশেষ করে রংপুর ও টাঙ্গাইলে নারীর ক্ষমতায়নকে সরাসরি অর্থনীতির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন। তার বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’। সেখানে তিনি নারীদের ‘গৃহিণী’ সম্বোধন করেছেন। তার যুক্তি, রাষ্ট্রের দেওয়া সহায়তা সরাসরি নারীর হাতে পৌঁছালে পুরো পরিবার উপকৃত হবে।
তারেক রহমান কয়েকটি জনসভায় উল্লেখ করেছেন, নারীকে পেছনে ফেলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। চট্টগ্রামের জনসভায় তিনি বলেন, নারীদের একটি বৃহৎ অংশ আজ শিক্ষিত হয়েছে। কিন্তু সেই নারীদেরকে আমরা স্বাবলম্বী করে, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চাই এবং সেই জন্যই আমরা বলেছি, আপনাদের ভোটে ইনশাআল্লাহ আগামী ১২ তারিখে বিএনপি সরকার গঠনে সক্ষম হলে আমরা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, গ্রাম-গঞ্জসহ সকল পরিবারের নারীদের কাছে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই।
তার বক্তব্যে নারীদের ক্ষুদ্র ব্যবসা, হাঁস-মুরগি পালন এবং সংসারের হাল ধরার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি নারীকে দেখছেন পরিবারের ‘ম্যানেজার’ হিসেবে এবং তাকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তবে এখানেও নারীকে মূলত ‘গৃহস্থালি’ গণ্ডির ভেতরেই বেশি দেখা গেছে; রাজনৈতিক নেতৃত্বে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর ভূমিকা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো কথাই ছিল না তার বক্তব্যে।
নারী ভোটারদের মন জয় করতে অতীতে নারীশিক্ষা অবৈতনিক করায় বিএনপির কৃতিত্বের প্রসঙ্গ বারবার টেনেছেন তারেক, কিন্তু ভবিষ্যতে নারীর উচ্চশিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বিস্তারিত কোনো রোডম্যাপ দেননি।
অন্যদিকে জামায়াত আমিরের বক্তব্যে নারীরা এসেছেন ভিন্ন আঙ্গিকে। সেখানে অর্থনীতির চেয়ে ‘নৈতিকতা’, ‘সম্মান’ এবং ‘নিরাপত্তার’ বুলিই বেশি ছিল।
ডা. শফিকুর রহমান নারীকে সংজ্ঞায়িত করেছেন মূলত ‘মা’ এবং ‘বোন’ হিসেবে। ঢাকা-১৫ এবং চট্টগ্রামের জনসভায় তিনি আবেগী সুরে প্রশ্ন রেখেছেন, কার কার ঘরে মা-বোন নাই? তিনি নারীকে ‘মায়ের জাতি’ হিসেবে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়ার কথা বলেছেন।
মিরপুরে নির্বাচনী প্রথম জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, মায়েরা সম্মানের জাতি। মা ছাড়া দুনিয়ায় দুইজন মাত্র পয়দা হয়েছেন--হযরতে আদম আলাইহিস সালাতু সালাম এবং হযরতে হাওয়া আলাইহিস সালাতু সালাম। আর কোনো মানব সন্তান দুনিয়ায় আসেন নাই মার পেট ছাড়া। সুতরাং আমরা সবাই মায়ের কাছে ঋণী ... আচ্ছা বাপের পেটে জন্ম নিয়েছেন একজন দেখি হাত তুলেন তো এরকম কেউ আছেন কিনা? তাও নাই। বাপের বুকের দুধ খেয়েছেন একজন হাত তুলেন। নাই। তাহলে এই দুই জায়গায় মা-রা অনন্যা। তাদের কোনো তুলনা নাই, তারা অতুল, অতুলনীয়। আমরা সেই মা-দেরকে সম্মানের জায়গায় রাখতে চাই। কর্মক্ষেত্রে তারা সম্মানের সঙ্গে ইনশাআল্লাহ তারা তাদের দায়িত্ব পালন করবেন।
জামায়াত নেতার বক্তব্যে নারীর ‘অধিকার’ না, বরং গুরুত্ব পেয়েছে ‘সুরক্ষা’। তিনি নারীকে দেখছেন এমন এক সত্তা হিসেবে যাকে সমাজ ও রাষ্ট্রের ‘রক্ষা’ করতে হবে। ডে-কেয়ার সেন্টারের মতো আধুনিক ধারণার কথা বললেও, তার মূল ফোকাস ছিল নারীর ‘ম্যাটারনাল’ বা মাতৃত্বকালীন ভূমিকার ওপর।
গাজীপুরের জনসভায় তিনি কর্মজীবী মায়েদের জন্য কর্মঘণ্টা ৮ থেকে কমিয়ে ৫ ঘণ্টা করা এবং বাকি ৩ ঘণ্টার বেতন রাষ্ট্র থেকে ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব দেন। ডে-কেয়ার সেন্টারের মতো আধুনিক ধারণার কথা বললেও, তাঁর মূল ফোকাস ছিল নারীর ‘ম্যাটারনাল’ বা মাতৃত্বকালীন ভূমিকার ওপর।
এভাবেই দুই নেতার ৫ শতাংশের বৃত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল নারী প্রসঙ্গ। একবিংশ শতাব্দীর নারীদের মূল দাবিগুলো--কর্মসংস্থান বাড়ানো, নেতৃত্বে অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা--এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি এই দুই নেতা। এমনকি পারিবারিক সহিংসতা রোধ বা সাইবার জগতে নারীদের হয়রানি বন্ধে সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর কথাও উঠে আসেনি তাদের বক্তব্যে।
সংখ্যালঘু অধিকার: ‘ভোট’ বনাম ‘অস্তিত্ব’
দেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার ও নিরাপত্তা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যু। তবে এবারের নির্বাচনী মঞ্চের গর্জনে এই বিষয়টি প্রায় ‘উপেক্ষিত’ রয়ে গেছে।
‘দ্য হুইসেল’-এর শব্দ-বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে দুই নেতার বক্তব্যে শব্দ খরচ ছিল নামমাত্র। বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই ইস্যুতে কথা বলেছেন মোট শব্দের মাত্র ২.১৪ শতাংশ, আর ডা. শফিকুর রহমানের ক্ষেত্রে এই হার আরও কম--মাত্র ১.৭৫ শতাংশ। এবং এই স্বল্প শব্দের ভেতরও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বা অধিকারের ব্যাপারে কোনো কথা বলেননি এই দুই নেতা। আমরা সকল ধর্মের মানুষকে বুকে ধারণ করে বাংলাদেশ গড়তে চাই, সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ্যে এমন গৎবাঁধা শব্দচয়নই কেবল করেছেন দুই নেতা।
ভারত প্রশ্নে ‘কৌশলী’ নীরবতা
নির্বাচনী প্রচারণায় পররাষ্ট্রনীতি এবং বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি দুই প্রধান নেতার বক্তব্যে একেবারেই প্রান্তিক ইস্যু হিসেবে দেখা গেছে । শব্দ-বিশ্লেষণ থেকে বেরিয়ে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য, বিএনপি ও জামায়াতের এই দুই শীর্ষ নেতা তাদের ২০টি জনসভার একটিতেও একবারের জন্যও ‘ভারত’ নামটি মুখে আনেননি। দুজনেই ছিলেন অত্যন্ত ‘কৌশলী’।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তারেক রহমান ছিলেন ‘সাবধানী’। তার ১০টি জনসভার মোট শব্দের মাত্র ০.১২% ব্যয় হয়েছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে। এমনকি তার সামগ্রিক বক্তব্যে পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত ঘরটি ছিল শূন্য শতাংশ।
সিলেটে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণার প্রথম জনসভায় তিনি শুধু ‘দিল্লী’র নাম মুখে এনেছেন, তাও শেখ হাসিনার আমলের সমালোচনা করতে গিয়ে। বলেছেন, “সে জন্যই আমরা বলেছি একটি কথা, আমরা দেখেছি গত ১৫-১৬ বছর কিভাবে এই দেশকে অন্য দেশের কাছে বন্ধক দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেজন্যই আমি বলেছি, দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোন দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।
রংপুরের নির্বাচনি জনসভা করেছেন দুই নেতাই। উত্তরাঞ্চলের ‘লাইফলাইন’ খ্যাত তিস্তা নদীর পানি সংকট নিয়ে উভয় নেতাই রংপুরবাসীকে আশার বাণী শুনিয়েছেন ঠিকই, তবে পানি সংকটের মূল উৎস নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কেউই ‘ভারত’ শব্দটি একবারও উচ্চারণ করেননি।
উভয় নেতাই হেঁটেছেন ‘অভ্যন্তরীণ সমাধানের’ পথে। ক্ষমতায় গেলে তারেক রহমান ‘তিস্তা ব্যারেজ’ প্রকল্প আর শফিকুর রহমান ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। দুজনের একজনও ভারতের সঙ্গে ‘তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি’ নিয়ে একটি কথাও বলেননি।
জামায়াত আমীরের বক্তব্যে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে শব্দের হার ছিল ০.৫২ শতাংশ। চট্টগ্রামের জনসভায় তিনি বলেছেন, জুলাই যুদ্ধারা বলেছিল জীবন দিবো, জুলাই দিবো না। আমরা তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতেছি জীবন দিবো, মাটি দেবো না। কোনো আধিপত্যবাদ আর বাংলাদেশে মানা হবে না। বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে ইনশাআল্লাহ।
মব জাস্টিস ও বিচার
৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বেহাল দশা, বিশেষ করে সারাদেশে ছড়িয়ে যাওয়া মব সন্ত্রাস দেশবাসীর কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি। কিন্তু নেতাদের বক্তব্যে এ নিয়ে কোনো কঠোর বার্তা বা সতর্কবাণী ছিল না। এমনকি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি নিয়ে দুজনের বক্তব্যই ছিল নামমাত্র। তারেক রহমান তার বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কথা বলেছেন মাত্র ১.৫০ শতাংশ শব্দ খরচ করে, আর ডা. শফিকুর রহমানের ক্ষেত্রে এই হার আরও নগণ্য, মাত্র ০.৪৩ শতাংশ।
সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়েও তাদের কোনো কথা বলতে শোনা যায়নি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো মৌলিক ও নাগরিক অধিকারের বিষয়েও তারা ছিলেন ততটাই নীরব বা হিসাবি। এই ইস্যুতে শফিকুর রহমান ১৯৭টি শব্দ ব্যবহার করলেও তারেক রহমান খরচ করেছেন মাত্র ১৩টি শব্দ।
শেখ হাসিনার বিচার নিয়ে নীরব
পলাতক স্বৈরাচার, মাফিয়া, লুটেরা, ভোট চোর, জালিম, খুনি, মজলুমের ওপর ঝাপিয়ে পড়া শক্তি - এই নামগুলোর মাধ্যমেই তারা ভোটারদের মনে বিগত শাসনের প্রতি ঘৃণা ও ক্ষোভকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু একটি বারের জন্যও বিএনপি চেয়ারম্যান এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির শেখ হাসিনার বিচার প্রসঙ্গটি মুখে আনেননি। উভয়েই ‘শেখ হাসিনার বিচার’-এর চেয়ে ‘শেখ হাসিনার আমল’-এর ব্যবচ্ছেদ করতে অনেক বেশি শব্দ খরচ করেছেন।
তারেক রহমান বিগত আমলকে চিত্রিত করেছেন ‘লুটেরা’ ও ‘মাফিয়া’ শাসন হিসেবে। তিনি ব্যাংক লুট, অর্থ পাচার এবং আয়নাঘরের কথা বলে ভোটারদের বোঝাতে চেয়েছেন যে, এই আমলটি ছিল মূলত একটি অপরাধী চক্রের শাসন। তার ভাষায় গত ১৫ বছর ১৬ বছরে, যারা এই দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছে এক বছর আগে, তারা যখন এই দেশের মানুষের টুঁটি চেপে ধরেছিল, তারা এই দেশের মানুষের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল, তারা এই দেশের মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল।
অন্যদিকে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান শেখ হাসিনাকে সরাসরি ‘খুনি’ এবং ‘জালিম’ হিসেবে সম্বোধন করেছেন। তিনি প্রায় সবগুলো জনসভায় বিগত সরকারের আমলে তার দল কতটা ‘মজলুম’ ছিল সেটা বোঝাতে অনেক শব্দ খরচ করলেও শেখ হাসিনার বিচার প্রসঙ্গে কোন শব্দই বলেননি। রংপুরে জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, আমরা ৫ আগস্ট বলেছিলাম, আমরা কথা রাখবো, হে জাতি আমরা মজলুম কিন্তু আমরা কারো ওপর থেকে প্রতিশোধ নেবো না। আল্লাহর কসম-একটা মানুষের দিকে আমরা হাত বাড়াইনি, আমরা কি কথা রেখেছি?
এই বিশ্লেষণ কোনো নেতার জনপ্রিয়তা মাপেনি, কোনো প্রতিশ্রুতির বাস্তবতা যাচাই করেনি। এটি শুধু একটি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে, নির্বাচনী জনসভায় কোন বিষয়গুলো কতটা গুরুত্ব পেয়েছে?
শব্দের এই হিসাব-নিকাশ আমাদের কিছু স্পষ্ট উত্তর দিয়েছে। দেখা গেছে, দুই প্রধান দলের শীর্ষ নেতাই কিছু ইস্যুতে কথা বলেছেন বেশি, কিছু ইস্যুতে কম, আর কিছু বিষয়ে প্রায় নীরব থেকেছেন। প্রতিপক্ষকে আক্রমণ ও রাজনৈতিক দোষারোপে ব্যয় হয়েছে দীর্ঘ সময় ও বিপুল শব্দ; কিন্তু জাতীয় জীবনের কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন বক্তৃতায় জায়গা পায়নি বা পেয়েছে খুব সীমিতভাবে।
৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি চর্চিত ও আকাঙ্ক্ষিত শব্দ হলো—‘রাষ্ট্র সংস্কার’। কিন্তু আমাদের নিবিড় শব্দ-বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নির্বাচনী জনসভার বিশাল মঞ্চে এই বিষয়টি প্রায় নিভৃতেই রয়ে গেছে। একইভাবে, বাংলাদেশের অস্তিত্বের মূলে থাকা ‘মুক্তিযুদ্ধ’ প্রসঙ্গটিও দুই নেতার বক্তব্যে ছিল অনুপস্থিত।
এমএসএম
Editor: TECHNO NEWS
Email :info@technoviable.com
Mobile : +8801914219906
৬২২, ফ্ল্যাট নং ১৩/বি, এভারগ্রীন মিজান স্কয়ার, বেগম রোকেয়া সরণি, ঢাকা-১২১৬, বাংলাদেশ।
Copyright TechnoNews 2025 | Developed By Technoviable