বিশ্ব ফুটবলে কিছু নির্দিষ্ট পজিশন যেন নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের পরিচয়ের অংশ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। ব্রাজিলের সৈকতে গড়ে ওঠে ফুটবলের সেরা ফুল-ব্যাকরা, সবচেয়ে অনমনীয় সেন্ট্রাল ডিফেন্ডাররা ইতালির কৌশলগত অগ্নিপরীক্ষায় তৈরি হন। আর আর্জেন্টিনার নাম্বার টেনরা- স্ট্রিট ফুটবলার, যারা শূন্য থেকে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে পারেন, বরাবরই ফুটবল বিশ্বের বিস্ময়।
তবে ২০১০ সালে সোনালী প্রজন্মের হাত ধরে বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে স্পেনের পরিচয় সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে গেছে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার পজিশনের সঙ্গে। জাভি, ইনিয়েস্তা, বুসকেটসদের হাত ধরে তৈরি হওয়া সেই ঐতিহ্য এখনও ধরে রেখেছে লা রোজারা।
স্পেনের মিডফিল্ড যেন এক অন্তহীন ফ্যাক্টরি। জাভি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জাবি আলোনসো, সার্জিও বুসকেটস, সান্তি কাজোরলা, সেস ফ্যাব্রেগাস, থিয়াগো আলকান্তারা, কোকে কিংবা দানি পারেখো- এক দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলকে শাসন করছে স্প্যানিশ মিডফিল্ডাররা। ২০১০ বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে ‘লা রোজা’র পরিচয়ই যেন হয়ে গেছে মাঝমাঠের দখলদারিত্ব। এখন সেই ঐতিহ্য বহন করছেন রদ্রি, পেদ্রি, ফ্যাবিয়ান রুইজ ও মার্টিন জুবিমেন্দিরা। আর পেছনে অপেক্ষায় আছেন গাভি, পাবলো বারিওস ও গাব্রি ভেইগার মতো নতুন প্রজন্ম।
কিন্তু স্পেন কিভাবে ধারাবাহিকভাবে এমন বিশ্বমানের মিডফিল্ডার তৈরি করে যাচ্ছে? সেই রহস্যই ব্যাখ্যা করেছেন তুলুজ কোচ ও বার্সেলোনার সাবেক একাডেমি কোচ কার্লেস মার্টিনেজ। তার মতে, স্পেনের ফুটবলের মূল শক্তি একটি অভিন্ন দর্শন। শুধু দক্ষতা নয়, খেলোয়াড়দের শেখানো হয় ‘কেন’ তারা কিছু করছে।
ফিফাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্টিনেজ বলেন, ‘স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের মধ্যে, বিশেষ করে মিডফিল্ডারদের মধ্যে আমি যে বিষয়টা সবচেয়ে বেশি দেখি, সেটা হলো খেলা বোঝার ক্ষমতা। এখানে সবসময় বোঝানো হয়- তুমি যদি এটা করো, তাহলে কী হবে। ট্রেনিংও শেখারই অংশ। কেন কিছু করছো সেটা বুঝতে পারলে খেলোয়াড় আরও উন্নত হয়।’
এই শিক্ষার প্রভাব ছোটবেলা থেকেই পড়ে খেলোয়াড়দের ওপর। ফলে স্প্যানিশ মিডফিল্ডাররা বল নিয়ন্ত্রণ, পজিশনিং এবং চারপাশের পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে আলাদা হয়ে ওঠেন। মার্টিনেজের মতে, মিডফিল্ডার তৈরি আলাদা করে শেখানো যায় না, এটা পুরো খেলাটার মধ্য দিয়েই তৈরি হয়।
তার ভাষায়, ‘সেন্ট্রাল মিডফিল্ডাররা দলের হৃদয়। সবকিছু তাদের মাধ্যমেই চলে। এই বোঝাপড়া তৈরি হয় রন্ডো, পজিশনাল প্লে, প্রগ্রেশন ড্রিল আর ম্যাচ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে, যেখানে প্রতিনিয়ত নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়।’
স্প্যানিশ ফুটবলে টেকনিক ও ট্যাকটিকসকে আলাদা করে দেখা হয় না। মার্টিনেজ বলেন, ‘তুমি যদি ভালো পজিশনে থাকো, তাহলে তোমার প্রথম টাচ আরও ভালো হবে, পাসিং হবে নিখুঁত এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও বাড়বে।’
এই সামগ্রিক পদ্ধতিই স্পেনের ধারাবাহিকতার মূল ভিত্তি। খেলোয়াড় বদলেছে; কিন্তু স্টাইল বদলায়নি। মার্টিনেজ তার খেলোয়াড়দের একটি কথাই বারবার বলেন- বল পাওয়ার আগেই পরের সিদ্ধান্ত মাথায় রাখতে হবে। আগে চারপাশ দেখো, ভাবো, তারপর সিদ্ধান্ত নাও।
তিনি বলেন, ‘যে দ্রুত ভাবতে পারে না, দ্রুত খেলতে পারে না কিংবা ফাঁকা খেলোয়াড় খুঁজে বের করতে পারে না, সে পিছিয়ে পড়ে।’
স্পেনের সাবেক যুব কোচ ও সাবেক মিডফিল্ডার টিটো ব্লাঙ্কোর ব্যাখ্যাও প্রায় একই। জাতীয় দলের বয়সভিত্তিক পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, স্পেনের ফুটবল কাঠামো শুরু থেকেই একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসরণ করে।
ব্লাঙ্কো বলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি অনূর্ধ্ব দল থেকে শুরু করে অনূর্ধ্ব-২১ পর্যন্ত প্রতিটি পজিশনের জন্য কী ধরনের গুণাবলি প্রয়োজন সেটা নির্ধারণ করতে।’
স্পেনের ৪-৩-৩ ফরমেশনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে তিন ধরনের মিডফিল্ডার- রদ্রির মতো ‘নাম্বার ৬’, পেদ্রির মতো ‘নাম্বার ৮’ এবং দানি ওলমো বা ফারমিন লোপেজের মতো ‘নাম্বার ১০’।
ব্লাঙ্কোর মতে, ‘আমরা বলের দখল রাখতে চাই, সুযোগ তৈরি করতে চাই এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে চাই। যত বেশি সময় বল আমাদের কাছে থাকবে, প্রতিপক্ষ তত কম ক্ষতি করতে পারবে।’
তবে কেবল আক্রমণ নয়, রক্ষণেও মিডফিল্ডারদের দায়িত্ব অনেক বড়। ব্লাঙ্কো বলেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেন্টার-ব্যাক ও মিডফিল্ডাররা যেন কাউন্টার অ্যাটাকে প্রতিপক্ষকে খুব কম জায়গা দেয়।’
তার মতে, আধুনিক স্প্যানিশ মিডফিল্ডারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য শুধু টেকনিক নয়, বরং খেলার বুদ্ধিমত্তা। ‘মিডফিল্ডারদের টেকনিক্যাল গুণাবলি থাকে স্বাভাবিকভাবেই, কিন্তু যারা ট্যাকটিক্যালি আরও উন্নতি করে, তারাই সেরা হয়ে ওঠে।’
বর্তমান স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জই হলো এত বেশি মানসম্পন্ন মিডফিল্ডারের মধ্যে সঠিক সমন্বয় খুঁজে বের করা। ইনজুরির কারণে ফারমিন লোপেজ ছিটকে গেলেও দলে আছেন রদ্রি, পেদ্রি, জুবিমেন্দি, ফ্যাবিয়ান রুইজ, মিকেল মেরিনো, অ্যালেক্স বায়েনা, গাভি ও মার্কোস লরেন্তের মতো তারকারা।
স্পেনের জন্য মিডফিল্ডার তৈরি করাই এখন আর চ্যালেঞ্জ নয়, বরং এত বেশি বিকল্পের মধ্যে বেছে নেওয়াটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। ২০১০ সালে বিশ্ব ফুটবলে স্পেনের পরিচয় বদলে দেওয়া প্রজন্ম থেকে শুরু করে ২০২৬ বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখা নতুন প্রজন্ম- সবার মধ্যেই একই বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট। বল পাওয়ার আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া, জায়গা বুঝে নড়াচড়া করা এবং বলের দখলকে উদ্দেশ্যমূলক ফুটবলে রূপ দেওয়া। স্পেনের ফুটবলে মাঝমাঠ এখনও সবচেয়ে বড় শক্তি, আর সেটা মোটেও সাময়িক কোনো বিষয় নয়।
আইএইচএস/
Editor: TECHNO NEWS
Email :info@technoviable.com
Mobile : +8801914219906
৬২২, ফ্ল্যাট নং ১৩/বি, এভারগ্রীন মিজান স্কয়ার, বেগম রোকেয়া সরণি, ঢাকা-১২১৬, বাংলাদেশ।
Copyright TechnoNews 2025 | Developed By Technoviable